বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ নিয়ে আলোচনায় আবারও নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। একদিকে দায়িত্বশীল মহল থেকে বলা হচ্ছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে, অন্যদিকে বিমানবন্দরসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় উচ্চ সতর্কতা জারি করা হচ্ছে। এই দ্বৈত বাস্তবতা প্রশ্ন তুলছে ঝুঁকি কি বাড়ছে, নাকি রাষ্ট্র ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃষ্টিভঙ্গিতেই শৈথিল্য এসেছে?
সাম্প্রতিক সতর্কবার্তা ও নিরাপত্তা জোরদারের ঘটনাগুলো স্পষ্ট করে যে, সম্ভাব্য হুমকি একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও লক্ষণীয়, জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় পুলিশের দৃশ্যমান তৎপরতা আগের মতো নেই। একসময় নিয়মিত অভিযান, গ্রেফতার ও নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়ার খবর জনসমক্ষে আসত। এখন সেই ধারাবাহিকতা অনেকটাই কম দৃশ্যমান, যা স্বাভাবিকভাবেই জনমনে উদ্বেগ তৈরি করছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার। উন্নয়ন, অর্থনীতি বা অন্যান্য রাজনৈতিক ইস্যুতে গুরুত্ব বাড়লেও জঙ্গিবাদবিরোধী কার্যক্রম আগের মতো কেন্দ্রীয় গুরুত্ব পাচ্ছে না এমন ধারণা তৈরি হয়েছে। অথচ অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, এই ধরনের শৈথিল্যই জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর জন্য সুযোগ তৈরি করে দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জঙ্গিবাদ কখনো হঠাৎ করে দৃশ্যমান হয় না; বরং এটি নীরবে সংগঠিত হয়। দীর্ঘ সময় “নিষ্ক্রিয়” থাকার আড়ালে তারা পুনর্গঠন করে, নতুন সদস্য সংগ্রহ করে এবং অনুকূল পরিবেশের অপেক্ষা করে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই নীরব পুনর্গঠনের লক্ষণ অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
এদিকে সমাজে ধর্মীয় অনুভূতিকে কেন্দ্র করে সহিংসতার ঘটনাও নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগ তুলে ব্যক্তিকে লক্ষ্যবস্তু করা, “নাস্তিক” তকমা দিয়ে হুমকি দেওয়া বা হত্যার মতো ঘটনা ঘটছে। এই প্রবণতা শুধু সামাজিক সহনশীলতার সংকটই নয়, বরং উগ্রপন্থার বিস্তারের একটি বিপজ্জনক ইঙ্গিত।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো এ ধরনের ঘটনায় রাষ্ট্র ও পুলিশের প্রতিক্রিয়া অনেক ক্ষেত্রে দৃশ্যমান নয় বা যথেষ্ট জোরালো মনে হচ্ছে না। দ্রুত ও দৃশ্যমান আইনি পদক্ষেপ না থাকলে অপরাধীদের মধ্যে এক ধরনের দৃষ্টান্তহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হয়, যা ভবিষ্যতে আরও বড় ঝুঁকি ডেকে আনতে পারে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় এমন দাবি করা ঠিক হবে না। তারা নজরদারি চালাচ্ছে এবং কিছু ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নিচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই তৎপরতা কি বর্তমান ঝুঁকির মাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? নাকি তা সীমিত পরিসরে আটকে আছে?
জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় শুধু অভিযান নয়, একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় বার্তাও প্রয়োজনযেখানে স্পষ্টভাবে জানানো হবে যে কোনো ধরনের উগ্রতা, সহিংসতা বা ধর্মের অপব্যবহার সহ্য করা হবে না। কিন্তু এই বার্তাটি কতটা কার্যকরভাবে পৌঁছাচ্ছে, সেটিও এখন প্রশ্নের মুখে।
বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাস্তবতা স্বীকার করা। জঙ্গি তৎপরতা পুরোপুরি নেই বলা যেমন ভুল, তেমনি ঝুঁকিকে হালকাভাবে নেওয়াও বিপজ্জনক। বর্তমান পরিস্থিতি একটি সতর্ক সংকেত, যা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শৈথিল্য মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে। পুলিশি তৎপরতা জোরদার করা, রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার পুনর্নির্ধারণ এবং ধর্মীয় উসকানিকে কঠোরভাবে মোকাবিলা এই তিনটি বিষয় এখন অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় নীরবতার আড়ালে যে ঝুঁকি জমে উঠছে, তা ভবিষ্যতে বড় সংকটে রূপ নিতে পারে।