মুহাম্মদ আব্দুল বারী
বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা এখন একটি নীরব মহামারির রূপ নিয়েছে। প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ও আহত হওয়ার ঘটনা ঘটছে। এসব দুর্ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতিই নয়, বরং একটি পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো, ট্রাফিক আইন অমান্য করা, অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন এবং পথচারীদের অসচেতনতা। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, চালকরা নির্ধারিত গতিসীমা মানেন না, হেলমেট বা সিটবেল্ট ব্যবহার করেন না এবং ট্রাফিক সিগন্যাল উপেক্ষা করেন। অন্যদিকে পথচারীরাও অনেক সময় নির্ধারিত জেব্রা ক্রসিং ব্যবহার না করে যত্রতত্র রাস্তা পার হন, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়।
এছাড়া দেশের অনেক সড়কের অবকাঠামোগত দুর্বলতাও দুর্ঘটনার একটি বড় কারণ। অপরিকল্পিত সড়ক নির্মাণ, ভাঙাচোরা রাস্তা, পর্যাপ্ত সাইনবোর্ডের অভাব এবং পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা না থাকা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। বিশেষ করে মহাসড়কগুলোতে আলাদা লেন না থাকায় ভারী যানবাহন, মোটরসাইকেল ও সাধারণ যান একসঙ্গে চলাচল করে, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন কঠোর আইন প্রয়োগ। বিদ্যমান সড়ক পরিবহন আইন যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হলে দুর্ঘটনার হার অনেকাংশে কমানো সম্ভব। ট্রাফিক আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে এবং জরিমানা ও শাস্তির বিধান কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে হবে।
তবে শুধু আইন প্রয়োগই যথেষ্ট নয়; এর পাশাপাশি প্রয়োজন জনসচেতনতা বৃদ্ধি। স্কুল, কলেজ এবং বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা উচিত। গণমাধ্যমও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
চালকদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স প্রদান প্রক্রিয়াও আরও কঠোর ও স্বচ্ছ করা প্রয়োজন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, যথাযথ দক্ষতা ছাড়াই চালকরা লাইসেন্স পেয়ে যান, যা পরবর্তীতে দুর্ঘটনার কারণ হয়। তাই ড্রাইভিং প্রশিক্ষণকে বাধ্যতামূলক ও মানসম্মত করা জরুরি।
যানবাহনের ফিটনেস নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাস্তায় চলাচলকারী প্রতিটি যানবাহনকে নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার আওতায় আনতে হবে। ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে সড়কে ঝুঁকিপূর্ণ যান চলাচল বন্ধ হয়।
পথচারীদের জন্য নিরাপদ ফুটপাত, জেব্রা ক্রসিং এবং ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ ও ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে ট্রাফিক পুলিশের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে নজরদারি জোরদার করা যেতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি যৌথ দায়িত্ব। সরকার, চালক, পথচারী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সাধারণ জনগণ সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া এটি সম্ভব নয়।
সর্বোপরি, নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে হলে আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি। নিয়ম মেনে চলার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে এবং অন্যের জীবনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। কারণ একটি দুর্ঘটনা শুধু একটি প্রাণই কেড়ে নেয় না, বরং একটি পরিবারের স্বপ্নও ভেঙে দেয়।
প্রভাষক,নর্থ ইস্ট ইউনিভার্সিটি সিলেট