লাইফস্টাইল ডেস্ক
আধুনিক জীবনে মোবাইল ফোন ও কম্পিউটার এখন দৈনন্দিন কাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে এই প্রযুক্তিনির্ভরতা নীরবে ডেকে আনছে এক নতুন স্বাস্থ্যঝুঁকি চোখের শুষ্কতা বা ড্রাই আই সিন্ড্রোম। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি এখন কেবল একটি রোগ নয়, বরং একটি ‘লাইফস্টাইল ডিস-অর্ডার’ হিসেবে দ্রুত বিস্তার লাভ করছে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে ড্রাই আই সিন্ড্রোমকে বলা হয় কেরাটোকনজাংটিভাইটিস সিক্কা। যখন চোখ পর্যাপ্ত অশ্রু তৈরি করতে পারে না অথবা উৎপন্ন অশ্রু সঠিকভাবে কাজ করতে ব্যর্থ হয়, তখনই এই সমস্যা দেখা দেয়। সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণা বলছে, বিশ্বজুড়ে এই সমস্যায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে, যা আধুনিক জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
চোখের সুরক্ষায় অশ্রুর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অশ্রু আসলে তিনটি স্তরের সমন্বয়ে গঠিত তেল, পানি এবং মিউকাস। এই তিন স্তর একত্রে চোখকে আর্দ্র রাখে, ধুলোবালি ও জীবাণু থেকে সুরক্ষা দেয় এবং দৃষ্টিশক্তি স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। কিন্তু এই স্তরগুলোর যেকোনো একটি ক্ষতিগ্রস্ত হলেই চোখের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায় এবং শুরু হয় শুষ্কতার সমস্যা।
ড্রাই আই সিন্ড্রোমের লক্ষণ সাধারণত ধীরে ধীরে প্রকাশ পায়। শুরুতে অনেকেই এটিকে সাধারণ ক্লান্তি বা সাময়িক অস্বস্তি হিসেবে এড়িয়ে যান। কিন্তু সময়ের সঙ্গে উপসর্গ বাড়তে থাকে। চোখে বালুকণার মতো অনুভূতি, জ্বালাপোড়া, খোঁচা লাগার মতো ব্যথা, চোখ ভারী লাগা কিংবা দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিন ব্যবহারের পর চোখ খোলা রাখতে কষ্ট হওয়া এসব লক্ষণ ড্রাই আই-এর সাধারণ চিহ্ন।
অনেক ক্ষেত্রে চোখ ঝাপসা দেখা যায় বা আলোতে তাকাতে অস্বস্তি হয়। আশ্চর্যের বিষয়, চোখে অতিরিক্ত পানি পড়াও এই রোগের একটি লক্ষণ হতে পারে। কারণ শুষ্কতার প্রতিক্রিয়ায় চোখ অতিরিক্ত অশ্রু উৎপন্ন করে। এছাড়া চোখের পাতায় প্রদাহ, কাঁপুনি বা সকালে চোখের পাপড়িতে জমাট ময়লা দেখা যাওয়াও সতর্কবার্তা হতে পারে।
চিকিৎসকদের মতে, ড্রাই আই বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ হলো অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার। মোবাইল বা কম্পিউটার ব্যবহারের সময় মানুষ স্বাভাবিকের তুলনায় কম পলক ফেলে। ফলে চোখের ওপরের অশ্রুস্তর দ্রুত শুকিয়ে যায়। দীর্ঘ সময় একটানা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা চোখের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে এবং ধীরে ধীরে সমস্যা বাড়িয়ে তোলে।
এছাড়া কম ঘুম, মানসিক চাপ, দূষিত পরিবেশ, দীর্ঘ সময় এসি রুমে থাকা এবং ধোঁয়া বা রাসায়নিকের সংস্পর্শে থাকা চোখের শুষ্কতা বাড়াতে ভূমিকা রাখে। বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অশ্রু উৎপাদন কমে যায়, বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি বেশি। কনট্যাক্ট লেন্স ব্যবহার বা ল্যাসিক সার্জারির পরও অনেকের মধ্যে এই সমস্যা দেখা যায়।
ডায়াবেটিস, অটোইমিউন রোগ এবং কিছু ওষুধ যেমন অ্যান্টিহিস্টামিন, অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট বা ডিউরেটিক ব্যবহারের ফলেও চোখের আর্দ্রতা কমে যেতে পারে। এছাড়া ভিটামিনের ঘাটতি, বিশেষ করে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের অভাব, অ্যালকোহল গ্রহণ এবং নিম্নমানের ঘুমও এই সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পঞ্চাশোর্ধ নারীরা, দীর্ঘ সময় স্ক্রিন ব্যবহারকারীরা এবং যারা শুষ্ক পরিবেশে থাকেন তারা ড্রাই আই সিন্ড্রোমের বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।
তবে আশার কথা হলো, এই সমস্যাটি পুরোপুরি নিরাময়যোগ্য না হলেও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এজন্য জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন আনা জরুরি। নিয়মিত বিরতি নিয়ে স্ক্রিন ব্যবহার করা, পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা, চোখে পানি দেওয়া বা কৃত্রিম অশ্রু ব্যবহার এবং সুষম খাদ্য গ্রহণ—এসব অভ্যাস ড্রাই আই নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে।
সবশেষে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, এই সমস্যাকে অবহেলা করা ঠিক নয়। সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে এটি দীর্ঘমেয়াদে চোখের স্থায়ী ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই প্রযুক্তির ব্যবহার যেমন প্রয়োজন, তেমনি চোখের যত্ন নেওয়াও সমান জরুরি।