1. desherchitrabd@gmail.com : Desher DesherChitra : Desher Chitra
শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:২০ অপরাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম :
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হামলার মামলা: কাজী কেরামত আলীকে আরও এক মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আদেশ দিল্লিতে আটক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, দাবি ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের ঢাবির হলে সরানো হচ্ছে ‘শহীদ ওসমান হাদি হল’ নাম, ফিরছে ‘শেখ মুজিবুর রহমান হল’ ওসমান হাদিকে জামায়াতের হুমকির অভিযোগ রাশেদ খাঁনের ইসলাম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ ও নৈতিকতার প্রশ্ন ইসলামে শিক্ষকের মর্যাদা: জ্ঞানের আলোয় মানুষ গড়ার মহান দায়িত্ব ইসলামের দৃষ্টিতে হিংসার আগুন ও বিদ্বেষের মরণব্যাধি HRW Warns of Renewed Political Repression Amid Mass Arrests in Bangladesh গঙ্গা চুক্তি নবায়নে ১২ ডিসেম্বরের আগেই সমঝোতার আশা Freedom of Expression Under Pressure in Bangladesh: Human Rights Concerns

পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি নেটওয়ার্ক: বাংলাদেশের তরুণদের টেনে নেওয়া হচ্ছে ছায়াযুদ্ধে

  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২১ ডিসেম্বর, ২০২৫

বিশেষ প্রতিবেদক

দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা বাস্তবতায় জঙ্গিবাদ নতুন কোনো বিষয় নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এর চরিত্রে এসেছে বড় ধরনের পরিবর্তন। সরাসরি হামলা বা সশস্ত্র সংঘর্ষের বদলে এখন জঙ্গি সংগঠনগুলো ঝুঁকছে ‘ছায়াযুদ্ধ’-এর দিকে। এই ছায়াযুদ্ধের অন্যতম প্রধান লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের তরুণ সমাজ।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি নেটওয়ার্কগুলো পরিকল্পিতভাবে এই অঞ্চলে তাদের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে।

ছায়াযুদ্ধ বলতে বোঝানো হয় এমন এক ধরনের সংঘাত, যেখানে অস্ত্রের ব্যবহার কম, কিন্তু আদর্শিক প্রভাব, ডিজিটাল প্রপাগান্ডা, অর্থায়ন ও গোপন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে রাষ্ট্র ও সমাজকে দুর্বল করা হয়। বাংলাদেশে এই কৌশল প্রয়োগের পেছনে রয়েছে কয়েকটি বাস্তব কারণ।

দেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপক বিস্তার এবং ধর্মীয় আবেগকে সহজে ব্যবহার করার সুযোগ—সব মিলিয়ে বাংলাদেশ জঙ্গি নেটওয়ার্কগুলোর কাছে একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।

গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠনগুলো এখন আর সরাসরি বড় হামলার পরিকল্পনায় যাচ্ছে না। বরং তারা দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নিয়েছে। এই কৌশলের মূল লক্ষ্য হলো তরুণদের মানসিকভাবে প্রস্তুত করা, রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা তৈরি করা এবং ধীরে ধীরে তাদের একটি চরমপন্থী আদর্শে অভ্যস্ত করে তোলা।

এই নেটওয়ার্কগুলো প্রধানত তিনটি স্তরে কাজ করছে। প্রথমত, অনলাইন প্রপাগান্ডা ও মতাদর্শিক মগজধোলাই। দ্বিতীয়ত, স্থানীয় পর্যায়ে স্লিপার সেল বা গোপন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও অর্থায়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। এসব কার্যক্রমের বেশিরভাগই চলে নীরবে, লোকচক্ষুর আড়ালে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই ছায়াযুদ্ধের প্রধান হাতিয়ার। ফেসবুক, টেলিগ্রাম, ইউটিউব এবং বিভিন্ন এনক্রিপটেড অ্যাপে তরুণদের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে বিকৃত ধর্মীয় ব্যাখ্যা। মুসলিম নিপীড়নের আবেগঘন গল্প, ষড়যন্ত্রতত্ত্ব এবং তথাকথিত ‘জিহাদি গৌরব’ তুলে ধরে তরুণদের প্রলুব্ধ করা হচ্ছে।

ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে রাষ্ট্র, আইন ও গণতন্ত্রবিরোধী মনোভাব তৈরি করা হচ্ছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এসব জঙ্গি নেটওয়ার্কের প্রধান লক্ষ্য হলো বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থী, বেকার ও হতাশ তরুণ, ধর্মীয়ভাবে আবেগপ্রবণ যুবক এবং সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিরা। অনেক ক্ষেত্রে প্রথমে সাধারণ ধর্মীয় আলোচনা বা সামাজিক অন্যায়ের প্রসঙ্গ তুলে বন্ধুত্ব গড়ে তোলা হয়। পরে ধাপে ধাপে চরমপন্থী ধারণা ঢুকিয়ে দেওয়া হয়।

ছায়াযুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—এখানে সবাইকে অস্ত্র হাতে নিতে হয় না। অনেক তরুণকে ব্যবহার করা হচ্ছে অনলাইন প্রচারণা চালাতে, অর্থ সংগ্রহ করতে, নিরাপদ যোগাযোগ রক্ষা করতে কিংবা নতুন সদস্য সংগ্রহে।

ফলে অনেক সময় একজন তরুণ নিজেই বুঝতে পারে না যে সে একটি আন্তর্জাতিক জঙ্গি নেটওয়ার্কের অংশ হয়ে গেছে।

অর্থায়নের ক্ষেত্রেও এসেছে পরিবর্তন। আগে বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেন হতো সরাসরি। এখন ব্যবহার করা হচ্ছে ছোট অঙ্কের অনলাইন ট্রান্সফার, ক্রিপ্টোকারেন্সি, হুন্ডি এবং দাতব্য কার্যক্রমের আড়াল। এতে অর্থের উৎস শনাক্ত করা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে।

কিছু ক্ষেত্রে ‘দাওয়াহ’ বা ‘মানবিক সহায়তা’র নামে অর্থ সংগ্রহ করে তা জঙ্গি তহবিলে পাঠানো হয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বড় ধরনের জঙ্গি হামলা কমলেও ‘নীরব র‍্যাডিকালাইজেশন’ নতুন উদ্বেগ হিসেবে দেখা দিয়েছে। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, আদর্শিকভাবে প্রস্তুত একটি তরুণ প্রজন্ম ভবিষ্যতে বড় ঝুঁকির কারণ হতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে সরকার ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলো সাইবার নজরদারি জোরদার করেছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালু করা হচ্ছে। পাশাপাশি পরিবার ও সমাজকে সম্পৃক্ত করে ডি-র‍্যাডিকালাইজেশন কার্যক্রমের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবার এই ছায়াযুদ্ধ মোকাবিলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তরুণদের আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন, চরমপন্থী বক্তব্য, সহিংসতার প্রতি সহানুভূতি কিংবা গোপন অনলাইন তৎপরতা ,এসব লক্ষণ অবহেলা করা উচিত নয়।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের ধারণা, পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি নেটওয়ার্কগুলোর চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদে অস্থিতিশীল করা, সাম্প্রদায়িক বিভাজন উসকে দেওয়া এবং আঞ্চলিক রাজনীতিতে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করা। সরাসরি যুদ্ধ নয়, বরং সমাজের ভেতর থেকেই রাষ্ট্রকে দুর্বল করে তোলাই তাদের মূল কৌশল।

পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি নেটওয়ার্কের এই ছায়াযুদ্ধ বাংলাদেশের জন্য নীরব কিন্তু গভীর হুমকি। অস্ত্রের শব্দ না থাকলেও এর ক্ষতি হতে পারে আরও ভয়াবহ, যেখানে একটি প্রজন্ম ধীরে ধীরে সহিংস মতাদর্শে প্রভাবিত হয়ে পড়ে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ—আইনের কঠোর প্রয়োগ, ডিজিটাল সচেতনতা, শিক্ষাভিত্তিক উদ্যোগ এবং মানবিক ও যুক্তিনির্ভর ধর্মীয় চর্চা।

Share this Post in Your Social Media

এই ধরনের আরও খবর
Copyright © 2025-2026, সাপ্তাহিক দেশের চিত্র. All rights reserved.
Theme Customized By BreakingNews