1. desherchitrabd@gmail.com : Desher DesherChitra : Desher Chitra
শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৪৯ অপরাহ্ন

বাংলাদেশে বিশ্বমানের আলেম তৈরির পথে বাধা কোথায়?

  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬

ধর্মীয় শিক্ষার বিস্তার ঘটেছে, বেড়েছে মাদ্রাসার সংখ্যা ও শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ। কিন্তু আন্তর্জাতিক পরিসরে ইসলামী জ্ঞানচর্চা, গবেষণা ও বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বে বাংলাদেশের অবস্থান কতটা শক্তিশালী ,সে প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

বাংলাদেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। এ দেশের মসজিদ, মাদ্রাসা ও ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে ইসলামী জ্ঞানচর্চা, ধর্মীয় মূল্যবোধের বিকাশ এবং সমাজে নৈতিক শিক্ষা বিস্তারে ভূমিকা রেখে আসছে।

প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী কোরআন, হাদিস, তাফসির, ফিকহ ও আরবি ভাষায় শিক্ষা গ্রহণ করছেন। তাঁদের অনেকে ধর্মীয় শিক্ষা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ অবদানও রাখছেন।

কিন্তু এত দীর্ঘ শিক্ষাব্যবস্থা ও বিপুলসংখ্যক ধর্মীয় শিক্ষার্থীর মধ্য থেকে আন্তর্জাতিক পরিসরে স্বীকৃত গবেষক, চিন্তাবিদ ও ধর্মতাত্ত্বিক নেতৃত্ব তুলনামূলকভাবে কম দৃশ্যমান কেন? বাংলাদেশের ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থার জন্য এটি আত্মসমালোচনা ও পুনর্মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

প্রথমেই স্পষ্ট করা দরকার, বাংলাদেশে বিশ্বমানের আলেম নেই এমন সার্বিক সিদ্ধান্ত দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ ছাড়া কোনো মন্তব্য করা যুক্তিসংগত নয়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, এ দেশে যে মেধা, জ্ঞান ও ধর্মীয় শিক্ষার ঐতিহ্য রয়েছে, তা আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা ও বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বে রূপান্তরিত হওয়ার সুযোগ কতটা পাচ্ছে।

এই প্রশ্নের কেন্দ্রে রয়েছে শিক্ষাব্যবস্থার প্রকৃতি। বাংলাদেশের অনেক ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রাচীন ধর্মীয় গ্রন্থ অধ্যয়ন, মুখস্থবিদ্যা এবং প্রচলিত পাঠক্রম অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। ইসলামী জ্ঞান সংরক্ষণে এসব পদ্ধতির ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনস্বীকার্য। কিন্তু শিক্ষার উদ্দেশ্য যদি শুধু পূর্ববর্তী জ্ঞান অর্জন ও পুনরুৎপাদনে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে মৌলিক গবেষণা, বিশ্লেষণী চিন্তা ও নতুন জ্ঞান সৃষ্টির ক্ষেত্র সংকুচিত হতে পারে।

একজন বিশ্বমানের আলেমকে শুধু প্রাচীন গ্রন্থের ব্যাখ্যা জানলেই চলবে না; সেই জ্ঞানের পদ্ধতি, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং সমকালীন জীবনে তার প্রয়োগ সম্পর্কেও গভীর উপলব্ধি থাকতে হবে।

আরেকটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো ধর্মীয় শিক্ষার সঙ্গে আধুনিক জ্ঞানচর্চার পর্যাপ্ত সমন্বয়ের অভাব। বর্তমান বিশ্বে অর্থনীতি, চিকিৎসাবিজ্ঞান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জৈবপ্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও মানবাধিকার নিয়ে নতুন নতুন প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।

এসব বিষয়ে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরতে হলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের মৌলিক জ্ঞান থাকা অপরিহার্য। শুধু ধর্মীয় গ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়ে জটিল সমকালীন সমস্যার কার্যকর বিশ্লেষণ সম্ভব নয়। প্রয়োজন ধর্মীয় জ্ঞানের গভীরতা এবং আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের সঙ্গে পরিচিতির সমন্বয়।

আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের আলেমদের উপস্থিতি সীমিত থাকার পেছনে ভাষাগত দুর্বলতাও একটি বিবেচ্য বিষয়। আরবি ইসলামী জ্ঞানচর্চার প্রধান ভাষা হলেও আন্তর্জাতিক গবেষণায় অংশগ্রহণ, বিভিন্ন দেশের গবেষকদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং বিশ্বব্যাপী নিজের চিন্তা তুলে ধরতে ইংরেজিসহ অন্যান্য ভাষায় দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ। বাংলায় রচিত বহু মূল্যবান ধর্মীয় গবেষণা আন্তর্জাতিক পাঠকের কাছে পৌঁছানোর সুযোগও সীমিত।

অনুবাদ, গবেষণাপত্র প্রকাশ এবং আন্তর্জাতিক একাডেমিক যোগাযোগ জোরদার করা না গেলে দেশের জ্ঞানভান্ডার বিশ্বপরিসরে যথাযথ পরিচিতি পাবে না।

গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশের প্রশ্নটিও উপেক্ষা করা যায় না। সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার, আধুনিক ডিজিটাল তথ্যভান্ডার, গবেষণা অনুদান, দক্ষ তত্ত্বাবধায়ক এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতা ছাড়া উচ্চমানের গবেষণা বিকশিত হওয়া কঠিন। বাংলাদেশের ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এসব সুযোগের যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে।

অনেক প্রতিষ্ঠানে গবেষণার অবকাঠামো ও অর্থায়ন সীমিত হতে পারে। ফলে মেধাবী শিক্ষার্থীদের উচ্চতর গবেষণায় উৎসাহিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি করা জরুরি।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সামাজিক স্বীকৃতির প্রশ্ন। একজন আলেমের জনপ্রিয়তা অনেক সময় তাঁর বক্তৃতা, ওয়াজ-মাহফিল কিংবা অনুসারীর সংখ্যার মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। অথচ গভীর গবেষণা, মৌলিক গ্রন্থ রচনা, আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশনা এবং জ্ঞানগত অবদানের মূল্যায়ন তুলনামূলকভাবে কম দৃশ্যমান থাকতে পারে।

জনপ্রিয় বক্তা হওয়া এবং আন্তর্জাতিক মানের গবেষক হওয়া এক বিষয় নয়। উভয়েরই সামাজিক গুরুত্ব রয়েছে, কিন্তু গবেষণার বিকাশে গবেষকদের জন্য আলাদা প্রণোদনা, বৃত্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রয়োজন।

এ ছাড়া মতপার্থক্যের প্রতি সহনশীলতা ও মুক্ত বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার পরিবেশও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামের ইতিহাসে বিভিন্ন মাজহাব, ব্যাখ্যাপদ্ধতি ও চিন্তাধারার মধ্যে বিতর্ক জ্ঞানচর্চাকে সমৃদ্ধ করেছে। যুক্তিনির্ভর প্রশ্ন, ভিন্নমতের অধ্যয়ন এবং প্রমাণের ভিত্তিতে মত সংশোধনের সুযোগ না থাকলে নতুন চিন্তার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

তাই ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পারস্পরিক শ্রদ্ধা বজায় রেখে যুক্তিপূর্ণ বিতর্ক ও গবেষণার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

এ অবস্থায় করণীয় কী? প্রথমত, মাদ্রাসার পাঠক্রমে গবেষণাপদ্ধতি, সমালোচনামূলক চিন্তা, আধুনিক সমাজবিজ্ঞান ও প্রাসঙ্গিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে হবে।

দ্বিতীয়ত, আরবি ভাষার গভীর দক্ষতার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ভাষায় গবেষণা ও প্রকাশনার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।

তৃতীয়ত, মেধাবী আলেম ও শিক্ষার্থীদের জন্য গবেষণাবৃত্তি, উন্নত গ্রন্থাগার এবং আন্তর্জাতিক বিনিময় কর্মসূচি চালু করা জরুরি।

চতুর্থত, কওমি ও আলিয়া মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয় এবং দেশি-বিদেশি গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতা বাড়াতে হবে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আলেমসমাজ, শিক্ষাবিদ, দাতা সংস্থা ও নীতিনির্ধারকদের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন।

বাংলাদেশে বিশ্বমানের আলেম তৈরির প্রশ্নটি কোনো বিশেষ শিক্ষাধারা বা ব্যক্তির ব্যর্থতার অভিযোগ নয়; এটি একটি বৃহত্তর প্রাতিষ্ঠানিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক চ্যালেঞ্জ।

তাই কাউকে দোষারোপ না করে সমস্যার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করাই হবে দায়িত্বশীল পথ। ধর্মীয় শিক্ষার ঐতিহ্যকে অক্ষুণ্ন রেখে গবেষণা, আধুনিক জ্ঞান, ভাষাগত দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের নতুন দিগন্ত উন্মুক্ত করতে হবে।

বাংলাদেশের সামনে এখন শুধু আরও বেশি আলেম তৈরির চ্যালেঞ্জ নয়; বরং এমন আলেম তৈরি করার চ্যালেঞ্জ, যাঁরা গভীর ধর্মীয় জ্ঞান, গবেষণার সক্ষমতা, যুক্তিবোধ ও সমকালীন বিশ্ব সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা নিয়ে আন্তর্জাতিক জ্ঞানচর্চায় অবদান রাখতে পারবেন। এই লক্ষ্য অর্জনে শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার, গবেষণার পরিবেশ সৃষ্টি এবং জ্ঞানভিত্তিক নেতৃত্বের বিকাশের কোনো বিকল্প নেই।

Share this Post in Your Social Media

এই ধরনের আরও খবর
Copyright © 2025-2026, সাপ্তাহিক দেশের চিত্র. All rights reserved.
Theme Customized By BreakingNews