গণতন্ত্রের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি হলো মানুষের কথা বলার অধিকার। সরকারকে প্রশ্ন করা, নীতির সমালোচনা করা, অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো এবং ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহির আওতায় আনা—এসব কোনো অপরাধ নয়; বরং একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য। অথচ বর্তমান বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত করা এবং সমালোচনামূলক কণ্ঠের ওপর হস্তক্ষেপের যে অভিযোগ উঠছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কারণ যে সরকার জনগণের ভোটে ক্ষমতায় আসে, সেই সরকারের প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত জনগণের কণ্ঠকে সম্মান করা চুপ করিয়ে দেওয়া নয়।
সরকারের সমালোচনা মানেই রাষ্ট্রবিরোধিতা নয়। একজন সাংবাদিক যখন সরকারের দুর্নীতি, অনিয়ম কিংবা প্রশাসনিক ব্যর্থতার খবর প্রকাশ করেন, তখন তিনি রাষ্ট্রের ক্ষতি করছেন না; বরং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করার কাজ করছেন। একজন নাগরিক যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের কোনো সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন, তখন তাকে শত্রু হিসেবে দেখার প্রবণতা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য বিপজ্জনক।
ক্ষমতার আসনে বসে সমালোচনা সহ্য করতে না পারা রাজনৈতিক দুর্বলতারই প্রকাশ। শক্তিশালী সরকার প্রশ্নকে ভয় পায় না; বরং প্রশ্নের উত্তর দেয়। শক্তিশালী সরকার সাংবাদিককে ভয় দেখায় না; বরং সাংবাদিকের কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হয়। শক্তিশালী সরকার বিরোধী মতকে দমন করে না; বরং যুক্তি ও নীতির মাধ্যমে জনগণের আস্থা অর্জন করে।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ ধীরে ধীরে একটি ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করে। সাংবাদিক নিজের ভাষা সংযত করেন, লেখক আত্মনিয়ন্ত্রণ করেন, সাধারণ নাগরিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কথা বলার আগে দশবার চিন্তা করেন। একসময় রাষ্ট্রে আইন থাকলেও স্বাধীন মতামত থাকে না। তখন গণতন্ত্র কাগজে-কলমে টিকে থাকে, কিন্তু তার প্রাণশক্তি হারিয়ে যায়।
বিএনপি অতীতে ক্ষমতাসীনদের সমালোচনা করার অধিকার, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক মতপ্রকাশের অধিকারের কথা বলেছে। তাই আজ ক্ষমতার কেন্দ্রে থেকে সেই একই স্বাধীনতার সীমা সংকুচিত করার অভিযোগ উঠলে প্রশ্ন উঠবেই তবে কি ক্ষমতার চরিত্রই মানুষকে বদলে দেয়?
বাংলাদেশের মানুষ আর কোনো ‘ভয়ভিত্তিক’ রাজনৈতিক সংস্কৃতি দেখতে চায় না। তারা এমন একটি রাষ্ট্র চায় যেখানে সরকারকে প্রশ্ন করা যাবে, সাংবাদিক স্বাধীনভাবে অনুসন্ধান করতে পারবেন, বিরোধী মত প্রকাশ করা যাবে এবং ক্ষমতাবান ব্যক্তিরাও আইনের ঊর্ধ্বে থাকবেন না।
সরকারের প্রতি স্পষ্ট বার্তা হলো সমালোচকের কণ্ঠ বন্ধ করে সাময়িকভাবে নীরবতা তৈরি করা যায়, কিন্তু জনগণের অসন্তোষ বন্ধ করা যায় না। গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে হলে সরকারকে সমালোচনাকে শত্রুতা হিসেবে নয়, আত্মসংশোধনের সুযোগ হিসেবে দেখতে হবে।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কোনো সরকারের দয়া নয়; এটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। সেই অধিকার সংকুচিত করার যেকোনো প্রচেষ্টা শুধু সাংবাদিক বা বিরোধী কণ্ঠের বিরুদ্ধে নয় এটি শেষ পর্যন্ত পুরো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধেই আঘাত। তাই এখনই প্রয়োজন ক্ষমতার অহংকার নয়, গণতান্ত্রিক সংযম; প্রতিশোধ নয়, জবাবদিহি; এবং নীরবতা নয় মুক্ত কণ্ঠের বাংলাদেশ।