২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে মে এই দুই মাসে বাংলাদেশজুড়ে খুন, ছিনতাই, ধর্ষণ, রাজনৈতিক সহিংসতা, সাইবার প্রতারণা ও মাদক পাচারের মতো নানা অপরাধের ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে বিভাগীয় শহর, শিল্পাঞ্চল ও সীমান্ত এলাকাগুলোতে সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে উৎকণ্ঠা বাড়তে দেখা গেছে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক অপরাধ, কিশোর গ্যাং এবং অনলাইন জালিয়াতির ঘটনাও আলোচনায় উঠে আসে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য ও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সময়ে সবচেয়ে বেশি আলোচিত ছিল রাজনৈতিক সংঘর্ষ, কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং মাদকসংক্রান্ত অপরাধ।
রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে ছিনতাই ও চুরির ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়ার অভিযোগ করেন সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে রাতের বেলায় সড়কে চলাচলকারী ব্যক্তিরা নিরাপত্তাহীনতার কথা জানান। এপ্রিলের শুরুতে ঢাকায় একাধিক ছিনতাইয়ের ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়। বিভিন্ন এলাকায় মোবাইল ফোন, মোটরসাইকেল ও ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা নিয়মিতভাবে সামনে আসে।
এদিকে কিশোর গ্যাং-সংক্রান্ত সহিংসতা আবারও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। রাজধানী, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে কয়েকটি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। কিছু ঘটনায় আহত হওয়ার পাশাপাশি প্রাণহানির অভিযোগও পাওয়া যায়। স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, অনেক এলাকায় কিশোর গ্যাং সদস্যরা প্রকাশ্যে ভয়ভীতি প্রদর্শন করছে।
মাদক পাচার ও চোরাচালানবিরোধী অভিযানও ছিল আলোচনায়। কক্সবাজার, কুমিল্লা সীমান্ত ও ঢাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে ইয়াবা, গাঁজা ও বিভিন্ন মাদকদ্রব্য জব্দ করা হয়। কয়েকটি ঘটনায় অস্ত্র উদ্ধারের তথ্যও প্রকাশ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। সীমান্ত এলাকায় সংঘবদ্ধ চোরাচালান চক্রের সক্রিয়তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনাও এ সময়ে জনমনে ক্ষোভ সৃষ্টি করে। বিভিন্ন জেলায় ধর্ষণ, যৌন হয়রানি ও ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগে মামলা দায়ের হয়। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে প্রতারণা ও ব্ল্যাকমেইলের ঘটনা বাড়ছে বলে জানায় পুলিশ। অনেক ক্ষেত্রে তরুণ-তরুণীদের টার্গেট করে ফাঁদে ফেলার অভিযোগ পাওয়া যায়।
সাইবার অপরাধও নতুন মাত্রা পেয়েছে। মোবাইল ব্যাংকিং জালিয়াতি, ফেসবুকভিত্তিক প্রতারণা, ভুয়া বিনিয়োগের প্রলোভন এবং আইডি হ্যাকিংয়ের ঘটনায় বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালানো হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ মোকাবিলায় আরও আধুনিক ব্যবস্থা প্রয়োজন।
রাজনৈতিক সহিংসতা নিয়েও ছিল উদ্বেগ। খুলনা, ঢাকা ও কয়েকটি জেলায় রাজনৈতিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল পরস্পরের বিরুদ্ধে সহিংসতা উসকে দেওয়ার অভিযোগ তোলে। ছাত্ররাজনীতি ঘিরেও উত্তেজনা দেখা যায় কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে।
দুর্নীতি ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও আলোচনায় আসে। সরকারি প্রকল্প, টেন্ডার প্রক্রিয়া এবং বিভিন্ন খাতে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়। স্বাস্থ্য খাতে অব্যবস্থাপনা এবং ওষুধ সরবরাহে অনিয়ম নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
এদিকে দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা দেখা যায়। অনলাইনে অনেকেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেন। তাদের অভিযোগ, অপরাধ দমন ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার কার্যকরভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না। বিশেষ করে খুন, ছিনতাই, ধর্ষণ ও কিশোর গ্যাং-সংক্রান্ত ঘটনাগুলো নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ বাড়ছে বলে বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে মতামত প্রকাশ করা হয়।
তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। পুলিশ, র্যাব ও অন্যান্য সংস্থা যৌথভাবে সন্ত্রাস, মাদক, চাঁদাবাজি ও সাইবার অপরাধ দমনে কাজ করছে। বিভিন্ন জেলায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে বিপুল সংখ্যক আসামি গ্রেপ্তারের তথ্যও জানানো হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক অস্থিরতা, বেকারত্ব, রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং প্রযুক্তির অপব্যবহার এসব কারণে অপরাধের ধরন বদলাচ্ছে। তারা বলছেন, শুধু আইন প্রয়োগ নয়, সামাজিক সচেতনতা, পারিবারিক নজরদারি এবং তরুণদের জন্য ইতিবাচক কর্মসংস্থান তৈরিও জরুরি।
সব মিলিয়ে এপ্রিল ও মে মাসজুড়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নানা আলোচনা ও উদ্বেগ তৈরি হলেও অপরাধ দমনে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন সাধারণ মানুষ।