বাংলাদেশে শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতা উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে। ২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসেই অন্তত ১৮০ শিশু ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন কিংবা ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছে বলে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা, গণমাধ্যম ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে গ্রামাঞ্চল দেশের প্রায় সব অঞ্চলেই শিশুদের বিরুদ্ধে ভয়াবহ সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রেই অভিযুক্ত ব্যক্তি পরিবারের পরিচিত, প্রতিবেশী, শিক্ষক কিংবা নিকট আত্মীয়।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, প্রকাশ্যে আসা ঘটনাগুলো প্রকৃত সংখ্যার একটি অংশ মাত্র। সামাজিক লজ্জা, প্রভাবশালীদের চাপ, বিচারহীনতা এবং দরিদ্র পরিবারের অসহায়ত্বের কারণে বহু ঘটনা থানায় পর্যন্ত পৌঁছায় না। ফলে প্রকৃত সংখ্যা আরও ভয়াবহ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৭ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুরাই সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার। শিশু অধিকারকর্মীরা বলছেন, এই বয়সী শিশুরা সহজেই প্রলোভন, ভয়ভীতি কিংবা প্রতারণার শিকার হয়। অনেক অপরাধী চকলেট, খেলনা বা ঘুরতে নেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে শিশুদের নির্জন স্থানে নিয়ে যায়।
চলতি বছরের কয়েকটি ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। মাগুরায় আট বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ সারা দেশে তীব্র প্রতিবাদ দেখা যায়। শিশুটির পরিবার অভিযোগ করে, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে প্রথমদিকে গড়িমসি করা হয়েছিল। পরে জনমতের চাপের মুখে পুলিশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে সাত বছরের এক শিশুকে নির্জন পাহাড়ে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা ও পরে গলা কেটে হত্যার ঘটনা দেশকে নাড়িয়ে দেয়। পুলিশ জানায়, শিশুটিকে ভয় দেখিয়ে পাহাড়ি এলাকায় নেওয়া হয়। পরে পরিচয় ফাঁস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তাকে হত্যা করা হয়।
ফরিদপুরে চকলেটের প্রলোভন দেখিয়ে এক শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা এবং পরে হত্যার অভিযোগ ওঠে এক ইজিবাইকচালকের বিরুদ্ধে। তদন্তে জানা যায়, হত্যার পর মরদেহ গোপনের চেষ্টাও করা হয়েছিল। এসব ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে শিশু নির্যাতনের মামলাগুলোর দ্রুত বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান।
বিশ্লেষকদের মতে, শিশু নির্যাতন বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। সামাজিক অবক্ষয়, মাদকাসক্তি, প্রযুক্তির অপব্যবহার, পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধপ্রবণতা বাড়িয়ে তুলছে। বিশেষ করে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে শিশুদের টার্গেট করে ব্ল্যাকমেইল ও যৌন হয়রানির ঘটনাও বাড়ছে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এবং অন্যান্য সংস্থার তথ্যমতে, অনেক ক্ষেত্রে ধর্ষণের পর শিশুদের হত্যা করা হচ্ছে, যাতে অপরাধের প্রমাণ নষ্ট করা যায়। কিছু ঘটনায় শিশুর মরদেহ পর্যন্ত নিখোঁজ রয়েছে। এছাড়া শিশুদের শারীরিক নির্যাতন করে হত্যার ঘটনাও বেড়েছে।
শুধু গ্রামাঞ্চল নয়, রাজধানীতেও শিশু নির্যাতনের হার উদ্বেগজনক। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন এলাকায় শিশু নির্যাতনের একাধিক মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে কিশোর গ্যাং, মাদক ও সামাজিক অস্থিরতার প্রভাব শিশুদের নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, অনেক পরিবার এখনও শিশুদের নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতন নয়। শিশুরা কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে কিংবা অনলাইনে কী করছে এসব বিষয়ে অভিভাবকদের পর্যাপ্ত নজরদারি নেই। একই সঙ্গে স্কুলগুলোতেও শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান দিয়ে এ সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্রকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। প্রতিটি স্কুলে শিশু সুরক্ষা নীতিমালা, কাউন্সেলিং ব্যবস্থা এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালুর দাবি জানিয়েছেন তারা।
পুলিশ সদর দপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, শিশু নির্যাতনের প্রতিটি ঘটনা গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে। তবে তারা স্বীকার করেছেন, দ্রুত বিচার নিশ্চিত না হলে অপরাধ কমানো কঠিন হবে। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী পরিবারকে নিরাপত্তা ও আইনি সহায়তা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেছেন তারা।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জরুরি ভিত্তিতে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন। গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত শিশু সহায়তা কেন্দ্র বৃদ্ধি, আইনি সহায়তা সহজ করা এবং অপরাধীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
বিশ্লেষকদের মতে, শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা এখন শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ভয় ও অনিরাপত্তার মধ্যেই বড় হবে।