পশ্চিমবঙ্গে টানা ১৫ বছরের শাসনের অবসানের পর রাজনৈতিকভাবে কঠিন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা ব্যানার্জী। রাজ্যের প্রথম বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর তিনি এখন নতুন করে রাজনৈতিক মেরুকরণ ও বিরোধী ঐক্যের ডাক দিচ্ছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এ পরিস্থিতি মমতার রাজনৈতিক জীবনের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বাম, অতিবাম ও জাতীয় শক্তিগুলোর প্রতি একজোট হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন মমতা ব্যানার্জী। একসময় যাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ আন্দোলন করে তিনি পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়েছিলেন, এখন তাদের সঙ্গেই রাজনৈতিক সমঝোতার ইঙ্গিত দিচ্ছেন তিনি।
২০১১ সালে বামফ্রন্ট সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে তৃণমূল কংগ্রেসকে ক্ষমতায় আনা ছিল মমতার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন। সেই সময় তার নেতৃত্ব, আন্দোলন এবং জনসম্পৃক্ততা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছিল। বিশেষ করে সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রাম আন্দোলনের মাধ্যমে তিনি গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আস্থা অর্জন করেন।
তবে ক্ষমতায় থাকার দীর্ঘ সময়ে দুর্নীতির অভিযোগ, প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং কর্মসংস্থান সংকট তৃণমূল সরকারের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিরোধীরা দাবি করেছে, শিল্পায়ন ও বড় বিনিয়োগ আকর্ষণে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। একই সঙ্গে দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগও জনমনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মমতা ব্যানার্জীর সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার আন্দোলনকেন্দ্রিক রাজনীতি এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ। কিন্তু প্রশাসক হিসেবে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনের পর সেই পুরোনো “সংগ্রামী নেত্রী” পরিচয়কে আবার কতটা কার্যকরভাবে ফিরিয়ে আনতে পারবেন, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মমতার সামনে এখন তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথমত, নির্বাচনি পরাজয়ের পর তিনি দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে পারেন কি না। দ্বিতীয়ত, দলের অভ্যন্তরে অভিষেক ব্যানার্জীর ভূমিকা ও নেতৃত্ব নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সেটি কীভাবে সামাল দেন। আর তৃতীয়ত, বিরোধী রাজনীতিতে ফিরে গিয়ে তিনি নতুন করে জনআন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে পারেন কি না।
অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, মমতা ব্যানার্জীকে এখনই রাজনীতি থেকে ছিটকে পড়া নেতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ এখনও তার দল উল্লেখযোগ্য ভোটব্যাংক ও সাংগঠনিক শক্তি ধরে রেখেছে। তবে বয়স, শারীরিক সক্ষমতা এবং বদলে যাওয়া রাজনৈতিক বাস্তবতা তার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে ক্ষমতাচ্যুত দলগুলোর পুনরায় ক্ষমতায় ফেরা বিরল। এখন দেখার বিষয়, মমতা ব্যানার্জী সেই ইতিহাস বদলাতে পারেন কি না।