মানবজীবনে হিংসা (হাসাদ) একটি গভীর ও ধ্বংসাত্মক মানসিক রোগ, যা ব্যক্তি, সমাজ এবং ঈমান তিনটিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে। ইসলাম হিংসাকে কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করেছে এবং এটিকে আত্মার জন্য এক মারাত্মক ব্যাধি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। হিংসা মানুষের অন্তরকে কলুষিত করে, সম্পর্ক নষ্ট করে এবং আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞ করে তোলে।
হিংসার অর্থ হলো অন্যের ভালো বা সফলতা দেখে তা সহ্য করতে না পারা এবং সেই নিয়ামত তার কাছ থেকে চলে যাক এই কামনা করা। এটি শুধু একটি খারাপ অভ্যাস নয়, বরং ঈমানের পরিপন্থী একটি মানসিকতা। কারণ একজন মুমিন বিশ্বাস করে যে, সব কিছু আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত।
কোরআনে আল্লাহ বলেন:
“তারা কি মানুষের প্রতি হিংসা করে আল্লাহ তাদেরকে তাঁর অনুগ্রহে যা দিয়েছেন তার জন্য?”
(সূরা আন-নিসা: ৫৪)
এই আয়াতে স্পষ্টভাবে বোঝানো হয়েছে, হিংসা করা মানে আল্লাহর সিদ্ধান্তের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করা। অর্থাৎ, হিংসা মানুষের ঈমানকে দুর্বল করে দেয়।
হাদিসেও হিংসার ভয়াবহতা তুলে ধরা হয়েছে। মহানবী (সা.) বলেছেন:
“তোমরা হিংসা থেকে বেঁচে থাকো। কারণ হিংসা সৎকর্মকে এমনভাবে ধ্বংস করে, যেমন আগুন কাঠকে পুড়িয়ে দেয়।”
(সুনান আবু দাউদ)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, হিংসা শুধু একটি অভ্যন্তরীণ অনুভূতি নয় এটি মানুষের আমল বা নেক কাজকেও ধ্বংস করে দেয়। একজন মানুষ যতই ইবাদত করুক না কেন, যদি তার অন্তরে হিংসা থাকে, তবে তার সৎকর্মের মূল্য কমে যেতে পারে।
হিংসার আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো এটি সমাজে বিভেদ সৃষ্টি করে। ভাইয়ের প্রতি ভাই, বন্ধুর প্রতি বন্ধু এমনকি আত্মীয়স্বজনের মধ্যেও বিরোধের সৃষ্টি হয় হিংসার কারণে। ইসলামে ভ্রাতৃত্ব ও পারস্পরিক ভালোবাসার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। মহানবী (সা.) বলেছেন:
“তোমরা পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করো না, হিংসা করো না… তোমরা আল্লাহর বান্দা হিসেবে ভাই ভাই হয়ে যাও।”
(সহিহ বুখারি ও মুসলিম)
এছাড়া, হিংসা মানুষের অন্তরে অশান্তি সৃষ্টি করে। একজন হিংসুক ব্যক্তি কখনোই শান্তিতে থাকতে পারে না। অন্যের সফলতা তাকে কষ্ট দেয়, এবং সে সবসময় অসন্তুষ্ট থাকে। ফলে তার নিজের জীবনও বিষাদময় হয়ে ওঠে। ইসলাম মানুষকে অন্তরের প্রশান্তি ও সন্তুষ্টির শিক্ষা দেয়, যা হিংসার সম্পূর্ণ বিপরীত।
হিংসা থেকে বাঁচার জন্য ইসলাম কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিয়েছে। প্রথমত, আল্লাহর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস রাখতে হবে যে, তিনি সবার জন্য যা নির্ধারণ করেছেন, তা সর্বোত্তম। দ্বিতীয়ত, অন্যের ভালো দেখে ঈর্ষা না করে বরং তাদের জন্য দোয়া করা উচিত। তৃতীয়ত, নিজের জীবনের নিয়ামতগুলোর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা জরুরি।
কোরআনে আল্লাহ বলেন:
“আর যদি তোমরা কৃতজ্ঞ হও, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের আরও বৃদ্ধি করে দেব।”
(সূরা ইবরাহিম: ৭)
এই আয়াত আমাদের শেখায়, অন্যের দিকে তাকিয়ে হিংসা না করে নিজের প্রাপ্তির জন্য কৃতজ্ঞ হওয়াই উত্তম।
হিংসা একটি আত্মঘাতী গুণ, যা মানুষকে ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। এটি ঈমানকে দুর্বল করে, আমল নষ্ট করে এবং সমাজে অশান্তি সৃষ্টি করে। তাই একজন মুসলিমের উচিত হিংসা থেকে নিজেকে দূরে রাখা এবং ভালোবাসা, সহানুভূতি ও কৃতজ্ঞতার মাধ্যমে নিজের চরিত্রকে গড়ে তোলা। ইসলাম আমাদের শেখায় অন্যের ভালোতে আনন্দিত হওয়া এবং আল্লাহর সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট থাকাই প্রকৃত সফলতার পথ।