1. desherchitrabd@gmail.com : Desher DesherChitra : Desher Chitra
সোমবার, ২৫ মে ২০২৬, ০৩:৩৩ পূর্বাহ্ন

ইসলামে ধর্ষণের শাস্তির বিধান

  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২৪ মে, ২০২৬

ধর্ষণ মানবসমাজের অন্যতম জঘন্য ও নিন্দনীয় অপরাধ। এটি শুধু একজন নারীর শারীরিক ক্ষতিই করে না, বরং তার মানসিক, সামাজিক ও আত্মিক জীবনে গভীর আঘাত হানে। ইসলাম মানবমর্যাদা, শালীনতা ও নিরাপত্তাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। তাই ইসলামী শরিয়তে ধর্ষণকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং এর জন্য কঠিন শাস্তির বিধান নির্ধারণ করা হয়েছে। কুরআন, হাদিস ও ইসলামী ফিকহে ধর্ষণকে অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।

ইসলামী পরিভাষায় ধর্ষণকে সাধারণত “জবরদস্তিমূলক ব্যভিচার” বা “ইকরাহ বিল যিনা” বলা হয়। অর্থাৎ কোনো নারীর সম্মতি ছাড়া জোরপূর্বক যৌন সম্পর্ক স্থাপন করা। ইসলামে নারীর সম্মতি ছাড়া কোনো ধরনের শারীরিক সম্পর্ক সম্পূর্ণ হারাম।

আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন: “তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেও না। নিশ্চয়ই তা অশ্লীল কাজ এবং খুবই নিকৃষ্ট পথ।” — সূরা আল-ইসরা, আয়াত ৩২

এই আয়াত থেকে বোঝা যায় যে ইসলাম শুধু ব্যভিচারই নিষিদ্ধ করেনি, বরং তার দিকে নিয়ে যায় এমন সব কাজও নিষিদ্ধ করেছে। ধর্ষণ যেহেতু জোরপূর্বক ব্যভিচার, তাই এটি আরও ভয়াবহ অপরাধ।

ইসলামী আইন অনুযায়ী ধর্ষণের শাস্তি পরিস্থিতি ও অপরাধের প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয়। যদি কোনো ব্যক্তি জোরপূর্বক নারীকে ধর্ষণ করে, তবে তাকে “হিরাবা” (সমাজে সন্ত্রাস ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি) অপরাধের আওতায়ও আনা যেতে পারে।

আল্লাহ তাআলা বলেন:“যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করে বেড়ায়, তাদের শাস্তি হলো—তাদের হত্যা করা হবে, অথবা শূলীতে চড়ানো হবে, অথবা তাদের হাত-পা বিপরীত দিক থেকে কেটে ফেলা হবে, অথবা দেশ থেকে নির্বাসিত করা হবে।” — সূরা আল-মায়িদা, আয়াত ৩৩

অনেক ফকিহ বা ইসলামী আইনবিদ ধর্ষণকে এই আয়াতের অন্তর্ভুক্ত গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করেছেন, কারণ ধর্ষণ সমাজে ভয়, বিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি করে।

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সময়েও ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছিল এবং তিনি এর বিচার করেছিলেন। একটি হাদিসে বর্ণিত আছে:

এক নারী নামাজের উদ্দেশ্যে বের হলে এক ব্যক্তি তাকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে। পরে অপরাধীকে শনাক্ত করা হলে রাসূলুল্লাহ (সা.) তাকে শাস্তি দেন এবং নারীর ওপর কোনো শাস্তি আরোপ করেননি।

হাদিসে এসেছে: “রাসূলুল্লাহ (সা.) ধর্ষণকারী ব্যক্তিকে রজম (পাথর নিক্ষেপে মৃত্যুদণ্ড) করার নির্দেশ দেন।” — সুনান আবু দাউদ, হাদিস নং ৪৩৭৯

এই হাদিস থেকে বোঝা যায়: ১. ধর্ষণের দায় সম্পূর্ণ অপরাধীর ওপর বর্তায়। ২. ভুক্তভোগী নারী কোনো অপরাধী নয়। ৩. ধর্ষণকারী কঠোর শাস্তির উপযুক্ত।

ইসলামী ফিকহ অনুযায়ী ধর্ষণকারী যদি বিবাহিত হয়, তবে তার শাস্তি হতে পারে রজম অর্থাৎ পাথর নিক্ষেপে মৃত্যুদণ্ড। আর যদি অবিবাহিত হয়, তবে তাকে একশ বেত্রাঘাত এবং নির্বাসনের শাস্তি দেওয়া হতে পারে।

আল্লাহ তাআলা বলেন: “ব্যভিচারিণী নারী ও ব্যভিচারী পুরুষ—তাদের প্রত্যেককে একশ বেত্রাঘাত করো।” — সূরা আন-নূর, আয়াত ২

তবে ধর্ষণের ক্ষেত্রে শুধু ব্যভিচারের শাস্তিই নয়, বরং জোরজবরদস্তি, সহিংসতা ও সামাজিক ক্ষতির কারণে আরও কঠোর শাস্তি আরোপ করা যেতে পারে।

ইসলাম ধর্ষণের শিকার নারীকে দোষারোপ করে না। বরং তাকে নির্দোষ ও মজলুম হিসেবে বিবেচনা করে। ইসলামে জোরপূর্বক সংঘটিত অপরাধের জন্য ভুক্তভোগীকে শাস্তি দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “আমার উম্মতের ভুল, ভুলে যাওয়া এবং জোরপূর্বক করানো কাজের গুনাহ মাফ করা হয়েছে।” — সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ২০৪৫

এই হাদিস থেকে বোঝা যায় যে, জোরপূর্বক ধর্ষণের শিকার নারী কোনো গুনাহগার নয়। বরং সমাজের দায়িত্ব হলো তাকে নিরাপত্তা, সহমর্মিতা ও ন্যায়বিচার প্রদান করা।

ইসলাম শুধু শাস্তির বিধান দিয়েই থেমে থাকেনি; বরং ধর্ষণ প্রতিরোধে বিভিন্ন সামাজিক ও নৈতিক ব্যবস্থাও গ্রহণ করেছে। ইসলাম নারী-পুরুষ উভয়কে শালীনতা বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছে এবং দৃষ্টি সংযমের শিক্ষা প্রদান করেছে। একই সঙ্গে পর্দার বিধান, অশ্লীলতা ও ব্যভিচারের প্রসার রোধ, নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং ন্যায়ভিত্তিক বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, “মুমিন পুরুষদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত করে।”

সূরা আন-নূর, আয়াত ৩০। আবার নারীদের সম্পর্কেও বলা হয়েছে, “মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত করে।”  সূরা আন-নূর, আয়াত ৩১। এসব নির্দেশনার মাধ্যমে ইসলাম একটি নিরাপদ, পবিত্র ও মর্যাদাপূর্ণ সমাজ গঠনের শিক্ষা দিয়েছে।

ইসলামে ধর্ষণ একটি গুরুতর অপরাধ এবং মানবতার বিরুদ্ধে জঘন্য অন্যায় হিসেবে বিবেচিত। ইসলামী শরিয়ত ধর্ষণকারীর জন্য কঠোর শাস্তির বিধান দিয়েছে, যাতে সমাজে নিরাপত্তা ও নৈতিকতা বজায় থাকে। একই সঙ্গে ইসলাম ভুক্তভোগী নারীর সম্মান ও অধিকার রক্ষা করেছে এবং তাকে কোনোভাবেই দোষী সাব্যস্ত করেনি। কুরআন, হাদিস ও ইসলামী আইন থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে ইসলাম নারী নির্যাতন ও যৌন সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে।

তথ্যসূত্র

১. পবিত্র কুরআন — সূরা আল-ইসরা: ৩২ ২. পবিত্র কুরআন — সূরা আল-মায়িদা: ৩৩ ৩. পবিত্র কুরআন — সূরা আন-নূর: ২, ৩০-৩১ ৪. সুনান আবু দাউদ, হাদিস নং ৪৩৭৯ ৫. সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ২০৪৫ ৬. তাফসির ইবনে কাসির ৭. ফিকহুস সুন্নাহ

Share this Post in Your Social Media

এই ধরনের আরও খবর
Copyright © 2025-2026, সাপ্তাহিক দেশের চিত্র. All rights reserved.
Theme Customized By BreakingNews