ইসলামে কুরবানী একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। প্রতি বছর জিলহজ মাসের ১০, ১১ ও ১২ তারিখে সামর্থ্যবান মুসলমানরা আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পশু কুরবানী করে থাকেন। এটি শুধু পশু জবাইয়ের আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং ত্যাগ, তাকওয়া ও আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের প্রতীক। তবে অনেকের মনেই প্রশ্ন থাকে—ঠিক কত টাকা বা সম্পদ থাকলে একজন মুসলমানের ওপর কুরবানী ওয়াজিব হয়?
ইসলামী শরিয়তের বিধান অনুযায়ী, যেসব মুসলমান নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদের মালিক হন, তাদের ওপর কুরবানী ওয়াজিব হয়। এই সম্পদের পরিমাণকে বলা হয় “নিসাব”। সাধারণভাবে কুরবানীর নিসাব ও যাকাতের নিসাব প্রায় একই হলেও কিছু ক্ষেত্রে পার্থক্য রয়েছে।
প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন এবং মুকিম (ভ্রমণে নয়) এমন মুসলমান যদি প্রয়োজনের অতিরিক্ত নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদের মালিক হন, তাহলে তার ওপর কুরবানী ওয়াজিব হবে।
এক্ষেত্রে পুরুষ ও নারীর মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। একজন নারীর নিজস্ব স্বর্ণালংকার বা সঞ্চয় যদি নিসাব পরিমাণ হয়, তাহলে তার ওপরও কুরবানী ওয়াজিব হবে।
বর্তমানে অনেকেই জানতে চান, বাংলাদেশি টাকায় ঠিক কত টাকা থাকলে কুরবানী ওয়াজিব হয়। ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী, কুরবানীর নিসাব নির্ধারণ করা হয় স্বর্ণ বা রূপার মূল্যের ভিত্তিতে। সাধারণভাবে সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ অথবা সাড়ে বায়ান্ন ভরি রূপার সমমূল্যের সম্পদ থাকলে একজন মুসলমানের ওপর কুরবানী ওয়াজিব হয়।
বর্তমানে অধিকাংশ ইসলামি চিন্তাবিদ ও আলেম রূপার মূল্যকে ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেন। কারণ এতে তুলনামূলক বেশি মানুষ কুরবানীর আওতায় আসেন এবং সমাজে কুরবানীর উপকারিতা আরও বিস্তৃত হয়।
২০২৬ সালের বাংলাদেশি বাজারদর অনুযায়ী, সাড়ে বায়ান্ন ভরি রূপার মূল্য আনুমানিক ৮৫ হাজার থেকে ১ লাখ ১০ হাজার টাকার মধ্যে হতে পারে। বাজারে রূপার দামের ওঠানামার কারণে এই পরিমাণ সময়ভেদে পরিবর্তিত হতে পারে।
অর্থাৎ একজন ব্যক্তির কাছে প্রয়োজনীয় খরচ ও ব্যবহার্য জিনিসপত্র বাদ দিয়ে যদি নগদ টাকা, ব্যাংক সঞ্চয়, স্বর্ণ-রূপা, ব্যবসায়িক পণ্য বা অন্যান্য অতিরিক্ত সম্পদ মিলিয়ে অন্তত এই পরিমাণ সম্পদ থাকে, তাহলে তার ওপর কুরবানী ওয়াজিব হবে।
তবে কুরবানীর আগে সর্বশেষ বাজারদর অনুযায়ী নিসাব নির্ধারণ করা এবং প্রয়োজন হলে অভিজ্ঞ আলেমের পরামর্শ নেওয়া উত্তম।
কুরবানীর নিসাব নির্ধারণে যেসব সম্পদ গণনা করা হয়—
তবে নিজের বসবাসের বাড়ি, ব্যবহারের গাড়ি, প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র কিংবা দৈনন্দিন ব্যবহারের জিনিস নিসাবের অন্তর্ভুক্ত হবে না।
অনেকের প্রশ্ন থাকে, কারও ঋণ থাকলে তার ওপর কি কুরবানী ওয়াজিব হবে?
ইসলামী বিধান অনুযায়ী, যদি কারও ওপর এমন ঋণ থাকে যা পরিশোধ করার পর নিসাব পরিমাণ সম্পদ অবশিষ্ট না থাকে, তাহলে তার ওপর কুরবানী ওয়াজিব হবে না। তবে ঋণ পরিশোধের পরও যদি পর্যাপ্ত সম্পদ থাকে, তাহলে কুরবানী করতে হবে।
অনেকেই মনে করেন, পরিবারের একজন সদস্য কুরবানী দিলেই সবার পক্ষ থেকে আদায় হয়ে যায়। বাস্তবে বিষয়টি এমন নয়। পরিবারের প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক সদস্য আলাদাভাবে নিসাবের মালিক হলে তার ওপর পৃথক কুরবানী ওয়াজিব হবে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, স্বামী-স্ত্রী দুজনেরই যদি আলাদা সঞ্চয় বা স্বর্ণালংকার থাকে এবং তা নিসাব পরিমাণ হয়, তাহলে দুজনেরই আলাদা কুরবানী করতে হবে।
কুরবানী শুধু আর্থিক সামর্থ্যের বিষয় নয়; এটি আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা ও আত্মত্যাগের শিক্ষা দেয়। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেছেন, “আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না পশুর গোশত বা রক্ত; বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া।”
অর্থাৎ কুরবানীর মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর আদেশ পালন ও আত্মশুদ্ধি অর্জন। তাই সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কুরবানী না করা ইসলামের দৃষ্টিতে অনুচিত।
হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কুরবানী না করাকে কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করেছেন। এ কারণে মুসলমানদের উচিত কুরবানীর বিধান সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং সামর্থ্য অনুযায়ী এই ইবাদত আদায় করা।
কুরবানী শুধু ব্যক্তিগত ইবাদত নয়; এর সামাজিক গুরুত্বও অনেক। কুরবানীর মাধ্যমে সমাজের দরিদ্র ও অসহায় মানুষ মাংস খাওয়ার সুযোগ পান। ধনী-গরিবের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব ও সহমর্মিতা তৈরি হয়।
এছাড়া কুরবানী আমাদের ত্যাগের শিক্ষা দেয়। নিজের প্রিয় সম্পদ আল্লাহর পথে ব্যয় করার মধ্য দিয়ে একজন মুসলমান আত্মিক প্রশান্তি লাভ করেন।
প্রয়োজনের অতিরিক্ত নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকলে একজন মুসলমানের ওপর কুরবানী ওয়াজিব হয়। এটি কেবল আর্থিক সক্ষমতার বিষয় নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। তাই কুরবানীর প্রকৃত তাৎপর্য বুঝে আন্তরিকতার সঙ্গে এই ইবাদত পালন করা প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলমানের দায়িত্ব।