দেশের চিত্র ডেস্ক
দেশে জঙ্গিবাদ দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযান, গোয়েন্দা নজরদারি এবং বিচারিক কার্যক্রমের ফলে গত এক দশকে বড় ধরনের নাশকতার ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তবে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, জঙ্গিবাদ পুরোপুরি নির্মূল হয়েছে এমনটি বলা যাবে না। বিভিন্ন সময়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত বা নজরদারিতে থাকা একাধিক উগ্রপন্থী সংগঠনের সদস্যরা এখনো গোপনে সাংগঠনিক তৎপরতা চালানোর চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন মামলায় জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর অনেক আসামির পলাতক হয়ে যাওয়ার ঘটনাও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ২০টি জঙ্গি সংগঠন বা উগ্রবাদী নেটওয়ার্ক বিভিন্ন মাত্রায় নিরাপত্তা সংস্থার নজরদারিতে রয়েছে। এসব সংগঠনের মধ্যে কেউ সরাসরি সদস্য সংগ্রহে সক্রিয়, কেউ অনলাইনে উগ্রবাদী মতাদর্শ প্রচারে মনোযোগী, আবার কেউ ছোট ছোট গোপন সেল গঠনের মাধ্যমে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, এনক্রিপটেড মেসেজিং অ্যাপ এবং বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মকে কাজে লাগিয়ে নতুন সদস্য সংগ্রহের প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করেন।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, জঙ্গি সংগঠনগুলোর কার্যক্রমের ধরন আগের তুলনায় পরিবর্তিত হয়েছে। বড় আকারের সাংগঠনিক কাঠামোর পরিবর্তে এখন তারা ছোট ও বিচ্ছিন্ন সেলভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালনার দিকে ঝুঁকছে। ফলে তাদের শনাক্ত করা তুলনামূলক কঠিন হয়ে পড়ে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত অভিযান ও গোয়েন্দা তৎপরতার কারণে তারা প্রকাশ্যে সক্রিয় হতে না পারলেও সুযোগ পেলেই পুনর্গঠনের চেষ্টা করে।
অন্যদিকে, জঙ্গিবাদ-সংক্রান্ত বিভিন্ন মামলার বিচারপ্রক্রিয়ার মধ্যেই কিছু আসামি জামিনে মুক্তি পেয়ে নির্ধারিত সময়ে আদালতে হাজির না হয়ে আত্মগোপনে চলে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এতে মামলার কার্যক্রম বিলম্বিত হওয়ার পাশাপাশি তাদের পুনরায় উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আদালতের নির্দেশ অমান্য করে দীর্ঘদিন পলাতক থাকায় অনেকের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি হয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, জামিন পাওয়া একজন অভিযুক্তের সাংবিধানিক অধিকার হলেও আদালতের শর্ত মেনে চলা তার আইনি দায়িত্ব। কেউ যদি জামিনের অপব্যবহার করে পলাতক হন, তবে তা বিচারপ্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। এ কারণে উচ্চঝুঁকির মামলাগুলোতে জামিন-পরবর্তী পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা আরও কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
নিরাপত্তা সংস্থার কর্মকর্তারা বলছেন, জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই এখন শুধু অভিযাননির্ভর নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও আদর্শিক চ্যালেঞ্জ। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় নেতৃত্ব, স্থানীয় প্রশাসন এবং নাগরিক সমাজের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া উগ্রবাদ প্রতিরোধ সম্ভব নয়। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি, অনলাইনে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা মোকাবিলা এবং সন্দেহজনক তৎপরতা সম্পর্কে দ্রুত তথ্য দেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো প্রায়ই ধর্ম, রাজনীতি বা সামাজিক অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে দুর্বল মানসিক অবস্থায় থাকা ব্যক্তিদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। তাই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে কাউন্সেলিং, পুনর্বাসন এবং ইতিবাচক সামাজিক সম্পৃক্ততার উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার পাশাপাশি পরিবার ও সমাজের সচেতন ভূমিকায় তরুণরা উগ্রপন্থা থেকে ফিরে এসেছে বলেও উদাহরণ রয়েছে।
এদিকে, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো বলছে, জঙ্গিবাদবিরোধী অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং গোয়েন্দা নজরদারিও জোরদার করা হয়েছে। দেশজুড়ে বিভিন্ন স্থানে সন্দেহভাজন কার্যক্রমের ওপর নিয়মিত নজর রাখা হচ্ছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে তথ্য বিনিময় এবং আন্তঃদেশীয় সহযোগিতাও বাড়ানো হয়েছে, যাতে সীমান্ত পেরিয়ে অর্থায়ন, যোগাযোগ বা সদস্য চলাচল প্রতিরোধ করা যায়।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে অর্জিত সাফল্য ধরে রাখতে হলে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা, জামিনে মুক্ত আসামিদের কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করা এবং উগ্রবাদে জড়িয়ে পড়ার সামাজিক কারণগুলো মোকাবিলা করা জরুরি। একই সঙ্গে নাগরিকদেরও সচেতন থাকতে হবে এবং যেকোনো সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে।
সর্বোপরি, দেশে বড় ধরনের জঙ্গি হামলার ঘটনা কমে এলেও হুমকি পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। তাই জঙ্গি সংগঠনের পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা, জামিন নিয়ে পলাতক আসামিদের শনাক্তকরণ এবং অনলাইনে উগ্রবাদী প্রচারণা প্রতিরোধ এই তিনটি বিষয়কে সমান গুরুত্ব দিয়ে এগোতে হবে। রাষ্ট্র, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং নাগরিক সমাজের সমন্বিত উদ্যোগই জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।