মৌলভীবাজার জেলায় উদ্বেগজনক হারে বেড়ে চলেছে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য। বিশেষ করে জেলা শহর, শ্রীমঙ্গল, কুলাউড়া ও কমলগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় কিশোরদের সংঘবদ্ধ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। ছোটখাটো বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার, মাদক সেবন, ছিনতাই, মারামারি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেন্দ্রিক দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে এসব কিশোর গ্যাং।
স্থানীয়দের অভিযোগ, একসময় যেসব কিশোর স্কুল-কলেজমুখী ছিল, তাদের অনেকেই এখন নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। সামাজিক অবক্ষয়, পরিবারে পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব, মাদকের সহজলভ্যতা এবং প্রযুক্তির অপব্যবহারকে এ পরিস্থিতির অন্যতম কারণ হিসেবে মনে করছেন সচেতন মহল।
সম্প্রতি মৌলভীবাজার শহরের কয়েকটি এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন একাধিক তরুণ। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পথচারীরা জানান, সন্ধ্যার পর অনেক এলাকায় কিশোরদের দলবদ্ধ অবস্থানে চলাফেরা করতে দেখা যায়। তাদের মধ্যে অনেকের হাতে দেশীয় অস্ত্রও থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে।
শ্রীমঙ্গলের এক অভিভাবক বলেন, “আগে সন্তানদের নিয়ে এত ভয় ছিল না। এখন স্কুলে যাওয়া কিংবা কোচিং শেষে বাসায় ফেরা নিয়েও আতঙ্কে থাকতে হয়। ছোট ছোট ছেলেরা খুব দ্রুত খারাপ সঙ্গের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে।”
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বলছেন, কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে তারা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছেন। তবে শুধু আইন প্রয়োগ করে এ সমস্যা পুরোপুরি সমাধান সম্ভব নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।
মৌলভীবাজার জেলা পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। অপরাধে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি তাদের কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। তিনি বলেন, “কিশোরদের অপরাধ থেকে ফিরিয়ে আনতে সামাজিক সচেতনতা জরুরি। পরিবারকে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করতে হবে।”
সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, বর্তমানে অনেক কিশোর ভার্চুয়াল জগতে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রভাব বিস্তার, ভিডিও তৈরি কিংবা গ্রুপভিত্তিক আধিপত্যের প্রবণতা থেকেও অনেক সময় সংঘবদ্ধ গোষ্ঠী তৈরি হচ্ছে। এছাড়া বেকারত্ব, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক চর্চার অভাবও কিশোরদের বিপথগামী হওয়ার অন্যতম কারণ।
শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষা ও সামাজিক মূল্যবোধের চর্চা বাড়াতে হবে। ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে কিশোরদের ইতিবাচক ধারায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
সচেতন নাগরিকরা মনে করছেন, এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে কিশোর গ্যাং আরও বড় সামাজিক সংকটে রূপ নিতে পারে। তাই প্রশাসনের পাশাপাশি পরিবার ও সমাজকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।