1. desherchitrabd@gmail.com : Desher DesherChitra : Desher Chitra
মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:০১ পূর্বাহ্ন

আমরা কি কখনো সত্যিই সভ্য হব?

  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

গত একশ বছরে পৃথিবী বদলে গেছে অবিশ্বাস্যভাবে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতি মানুষের জীবনকে করেছে সহজ, দ্রুত ও আরামদায়ক। বিদ্যুৎ, আধুনিক চিকিৎসা, কম্পিউটার, মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট ,সবশেষে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের জীবনযাত্রায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। একশ বছর আগে যা কল্পনাও করা কঠিন ছিল, আজ তা আমাদের প্রতিদিনের বাস্তবতা। বাংলাদেশও এই পরিবর্তনের বাইরে নয়। গ্রামের একজন সাধারণ মানুষও এখন স্মার্টফোনের মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে বিশ্বের খবর জানতে পারেন।

কিন্তু এত উন্নতির পরও একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন থেকেই যায়,আমরা কি সত্যিই সভ্য হতে পেরেছি?

সভ্যতা মানে শুধু প্রযুক্তির ব্যবহার, বড় বড় ভবন, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা কিংবা অর্থনৈতিক অগ্রগতি নয়। সভ্যতার আসল পরিচয় মানুষের আচরণে। আমরা অন্যের মতামতকে কতটা সম্মান করি, দুর্বল মানুষকে কতটা নিরাপত্তা দিতে পারি, আইনের প্রতি কতটা আস্থা রাখি এবং ভিন্নমতকে কতটা সহ্য করতে পারি—এসবই একটি সমাজ কতটা সভ্য, তার গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বাস্তবতা এই প্রশ্নের উত্তর নিয়ে যথেষ্ট উদ্বেগ তৈরি করে। বিভিন্ন সময় সরকার বদলেছে, রাজনৈতিক স্লোগান বদলেছে; কিন্তু মানুষের ওপর মানুষের সহিংসতা, প্রতিহিংসা ও অসহিষ্ণুতার প্রবণতা পুরোপুরি বদলায়নি।

এর ভয়াবহতার একটি চিত্র পাওয়া যায় বিভিন্ন সংস্থার পরিসংখ্যানে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবে, ২০২৫ সালে মব সহিংসতায় অন্তত ১৯৭ জন নিহত হয়েছেন। একই বছরে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির হিসাবে রাজনৈতিক সহিংসতার ৯১৪টি ঘটনায় ১৩৩ জন নিহত এবং ৭ হাজার ৫১১ জন আহত হয়েছেন। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই ২৬১টি মব-সহিংসতার ঘটনায় ১৩৩ জন নিহত হয়েছেন বলে ওই সংস্থার হিসাবে উঠে এসেছে।

এসবকে নিছক সংখ্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একজন মানুষ, একটি পরিবার এবং একটি অসমাপ্ত জীবন। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগের সত্যতা যাচাই, বিচারিক প্রক্রিয়া কিংবা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই মানুষকে জনতার হাতে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। এটি কোনোভাবেই সভ্য সমাজের লক্ষণ হতে পারে না।

আমরা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকেও অনেক সময় প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখি না, শত্রু হিসেবে দেখি। ভিন্নমতকে যুক্তি দিয়ে মোকাবিলা করার পরিবর্তে অপমান, হুমকি কিংবা দমন করার প্রবণতা দেখা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি গুজব বা যাচাইহীন তথ্য মুহূর্তের মধ্যে হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে উত্তেজনা তৈরি হয়, সংখ্যালঘু ও দুর্বল মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। কখনো সংবাদমাধ্যম, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান কিংবা ভিন্নমতের কণ্ঠও জনতার ক্ষোভের লক্ষ্য হয়ে ওঠে।

অথচ আমাদের স্বাধীনতার স্বপ্ন এমন ছিল না। মুক্তিযুদ্ধ শুধু একটি পতাকা বা মানচিত্রের জন্য ছিল না। মানুষ চেয়েছিল এমন একটি দেশ, যেখানে মানুষের মর্যাদা থাকবে, আইনের শাসন থাকবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার অধিকার থাকবে এবং ভিন্নমতের মানুষও নিরাপদে বসবাস করতে পারবে।

আজ আমাদের হাতে এমন প্রযুক্তি আছে, যা কয়েক সেকেন্ডে কোটি মানুষের কাছে একটি তথ্য পৌঁছে দিতে পারে। কিন্তু সেই তথ্য সত্য না মিথ্যা, তা যাচাই করার দায়িত্ববোধ কি একই গতিতে তৈরি হয়েছে? আমরা সন্তানদের হাতে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি তুলে দিচ্ছি, কিন্তু তাদের কি শেখাচ্ছি অন্যকে সম্মান করতে? শেখাচ্ছি কি যে, নিজের মতের সঙ্গে অন্যের মত না মিললেও তাকে শত্রু ভাবা যাবে না?

প্রকৃত সভ্যতার পরীক্ষা এখানেই। একটি সমাজ কতটা উন্নত, তা শুধু তার অর্থনীতি বা প্রযুক্তি দিয়ে বিচার করা যায় না। বরং দেখতে হবে—একজন দুর্বল মানুষ কতটা নিরাপদ, একজন ভিন্নমতের মানুষ কতটা স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারেন, একজন অভিযুক্ত ব্যক্তি কতটা ন্যায়বিচার পান এবং একজন সংখ্যালঘু নাগরিক কতটা নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিয়ে বাঁচতে পারেন।

আমরা হয়তো আধুনিক হয়েছি, কিন্তু আধুনিক হওয়া আর সভ্য হওয়া এক কথা নয়। প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে বদলাতে পারে, কিন্তু আমাদের মানসিকতা বদলাতে পারে না। সেই পরিবর্তন আমাদের নিজেদেরই ঘটাতে হবে।

তাই প্রশ্নটি আজও আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে আমরা কি শুধু উন্নত হতে চাই, নাকি সত্যিকারের সভ্য সমাজও গড়ে তুলতে চাই? স্বাধীনতার এত বছর পর এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন সেই দেশের মানুষ শুধু প্রযুক্তিতে নয়, চিন্তা, আচরণ, সহনশীলতা ও মানবিকতাতেও উন্নত হয়।

Share this Post in Your Social Media

এই ধরনের আরও খবর
Copyright © 2025-2026, সাপ্তাহিক দেশের চিত্র. All rights reserved.
Theme Customized By BreakingNews